৩০ এপ্রিলের পর দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান: মাদক, জুয়া ও সিসা বার নির্মূলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর 'মাস্টার প্ল্যান'
ঢাকা: জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই আগামী ৩০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে মাদক, প্রথাগত জুয়া এবং অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে এক সুসমন্বিত ও সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। সোমবার (২৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ঘোষণা প্রদান করেন। মূলত দেশের যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সংসদীয় অধিবেশনে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সিসা লাউঞ্জ ও মাদকের রমরমা কারবার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি নোটিশ উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মতো আবাসিক এলাকার রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফের আড়ালে অবৈধ সিসা লাউঞ্জগুলো মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের মদদে এবং প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব প্রতিষ্ঠান বারবার তাদের ঠিকানা পরিবর্তন করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই দমানো যাচ্ছে না। রাত হলেই এসব স্থানে ‘বুনো উল্লাস’ চলে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
সাংসদ জয়নুল আবদিন ফারুকের নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সিসা বারের এই বিস্তারের জন্য সরাসরি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, অসাধু ব্যবসায়ী এবং প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে সিসা বার ও মাদকের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছিল। সে সময় সিসা বারগুলোতে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হলেও পরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেগুলো আবারও চালু করা হতো। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর এবং এরই মধ্যে গত ১৬ ও ২০ এপ্রিল রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সিসা ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান যে, ৩০ এপ্রিল সংসদের সেশন শেষ হওয়ার পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ, র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বৃহৎ অভিযান পরিচালিত হবে। তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো পুলিশ সদস্য বা প্রশাসনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় মদদ দেওয়ার অথবা অবৈধ ব্যবসায়ীদের সহায়তা করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না; বরং তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে কেবলমাত্র অপরাধী হিসেবেই তাদের বিচার করা হবে।
বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, যারা ঠিকানা পরিবর্তন করে বা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ব্যবসা করার চেষ্টা করছে, তাদের তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্সবিহীন বা শর্ত ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি অনলাইন জুয়া যা বর্তমান সময়ের এক নতুন অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তা নির্মূলেও বিশেষ কারিগরি টিম কাজ করবে বলে তিনি জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মাদককে একটি ‘জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই যুবসমাজকে এই মরণনেশা থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কতজন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার সঠিক এবং দীর্ঘ পরিসংখ্যান পরবর্তী নোটিশের মাধ্যমে সংসদে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হবে।