ইসলামী ব্যাংক লুটপাট: এস আলমের একাই খেলাপি ৫৭ হাজার কোটি টাকা
ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে ২০১৭ সালটি ছিল একটি কালো অধ্যায়। ওই বছরই একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপে শরিয়াহভিত্তিক ধারার পথিকৃৎ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের হাতে। সেই থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গত সাত বছরে ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার তথ্য মিলেছে। এক সময়ের লাভজনক ও আমানতকারীদের আস্থার প্রতীক এই ব্যাংকটি এখন ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকার বিশাল খেলাপি ঋণের বোঝা নিয়ে গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
গোয়েন্দা ছায়ায় ‘টেকওভার’ ও নীতিগত লুটপাট
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে কঠোর গোপনীয়তায় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এরপরই সাইফুল আলমের নেতৃত্বাধীন এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির মালিকানায় আসে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কোনো স্বাভাবিক ব্যবসায়িক টেকওভার ছিল না, বরং এটি ছিল ব্যাংকটিকে ব্যক্তিগত ‘পিগি ব্যাংকে’ পরিণত করার একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। মালিকানা পরিবর্তনের পর থেকেই ব্যাংকের ঋণ বিতরণের চিরাচরিত নিয়মগুলো ভেঙে ফেলা হয় এবং এস আলমের অনুসারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়।
শীর্ষ ২০ খেলাপির ১৫টিই এস আলম সংশ্লিষ্ট
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান খেলাপি ঋণের চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেক (৪৯.৩৪%)।
এস আলমের মূল ঋণের উৎসসমূহ: ব্যাংকের শীর্ষ ২০টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ১৫টিই সরাসরি এস আলম গ্রুপ ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশগুলো হলো:
এস আলম সুপার এডিবল অয়েল: ১৩,০৪০ কোটি টাকা।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার: ১০,২৮১ কোটি টাকা।
এস আলম ভেজিটেবল অয়েল: ১০,১১৩ কোটি টাকা।
সোনালী ট্রেডার্স: ৪,৮৫৩ কোটি টাকা।
চেমন ইস্পাত: ৩,৫৯২ কোটি টাকা।
এছাড়া সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম এবং ভাগ্নে মোস্তান বিল্লাহ আদিলের মাধ্যমে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘কাগুজে’ কোম্পানি ও মানি লন্ডারিংয়ের রহস্য
তদন্তে দেখা গেছে, এস আলম গ্রুপ কেবল নিজের নামে নয়, বরং শত শত কাগুজে বা ভুয়া কোম্পানি খুলে ঋণ নিয়েছে।
অস্তিত্বহীন ব্যবসা: ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রে উল্লিখিত ঠিকানায় কোনো ব্যবসার অস্তিত্ব নেই। ১,৪৬২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল কেবল একটি নামসর্বস্ব কাগুজে সত্তা।
ঋণের ডাইভারশন: মুরাদ এন্টারপ্রাইজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট ব্যবসার কথা বলে ঋণ নিলেও সেই অর্থ এস আলমের অন্যান্য পুরনো ঋণ পরিশোধে বা বিদেশে পাচার করতে ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এটি মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা: ‘অন্ধ’ নিয়ন্ত্রক
ইসলামী ব্যাংক যখন তারল্য সংকটে ধুঁকছিল এবং সিআরআর (CRR) ও এসএলআর (SLR) রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বিশেষ সুবিধায় ব্যাংকটিকে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। এস আলমের বেনামি ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে না দেখিয়ে নিয়মিত হিসেবে উপস্থাপনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অলিখিত নির্দেশনা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি: আইনি লড়াই ও পুনরুদ্ধারের লড়াই
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে।
মামলার পাহাড়: এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে ২৪টি এবং এনআই অ্যাক্টে ৩৬৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
চাকরিচ্যুতি: এস আলমের আমলে যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে নিয়োগ পাওয়া ৪,৬৮৫ জন কর্মীকে বরখাস্ত করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
আগামীর শঙ্কা: পুনর্বাসনের চেষ্টা?
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা গেছে, এস আলমের অনুসারীরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন আন্দোলন ও শোডাউনের মাধ্যমে তারা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে ব্যাংকটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, "আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (NDA) সই করেছি। ব্যাংকটি ধীরে ধীরে তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠছে।"
রিপোর্টারের মতামত ও উপসংহার
ইসলামী ব্যাংকের এই সংকট কেবল একটি ব্যাংকের পতন নয়, বরং পুরো আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যর্থতার এক করুণ দৃষ্টান্ত। ৯২ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এস আলম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিচারিক ব্যবস্থাপনাই হতে পারে এই সংকটের একমাত্র সমাধান।