জেন-জি বিপ্লব
নেপালে তারুণ্যের জয়গান: বিশ্বজুড়ে আশার আলো
তারুণ্যের অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া নেপাল: বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে এক নতুন বিপ্লবের আশা
নেপালের রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের হাত ধরে দীর্ঘদিনের পুরোনো রাজনৈতিক প্রথা ভেঙে হিমালয়ের পাদদেশে জন্ম নিয়েছে এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। নেপালের এই রূপান্তর এখন কেবল একটি দেশের গল্প নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ধুঁকতে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য এক উজ্জ্বল বাতিঘর।
ছাই থেকে জন্মানো বিপ্লব
গত সেপ্টেম্বরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা ভুলবার নয়। চারদিকে বারুদের গন্ধ, পুলিশের দমন-পীড়ন আর পার্লামেন্টের সামনে থেকে লাশ টেনে নিয়ে যাওয়ার বীভৎস স্মৃতি। ২৮ বছর বয়সী বাবলু গুপ্তা ছিলেন সেই বিক্ষোভের সম্মুখসারির এক লড়াকু সৈনিক। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার এক নজিরবিহীন অভ্যুত্থানে পতন ঘটেছিল সত্তরোর্ধ্ব প্রধানমন্ত্রীর। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম নিয়েছে আজকের নতুন নেপাল।
মার্চের নির্বাচনে সেই বিপ্লবের প্রতিফলন দেখা গেল ব্যালট বক্সে। বাবলু গুপ্তার মতো অনেক ‘জেন-জি’ যোদ্ধা এখন নেপালের আইনপ্রণেতা। এবারের পার্লামেন্টে ৩০ বা তার কম বয়সী সদস্যদের হার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ শতাংশে।
‘বালেন’ এবং এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা
নেপালের এই রাজনৈতিক ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ৩৫ বছর বয়সী র্যাপার এবং কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ (বালেন)। গত ২৭ মার্চ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলিকে হটিয়ে বালেনের এই জয় বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, নেপালের রাজনীতিতে এখন আর কেউ ‘আইনের ঊর্ধ্বে’ নয়। তরুণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং স্পষ্ট জানিয়েছেন, "দেশ এখন এক নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে।"
পরিবর্তনের নেপথ্যে: হতাশা ও স্বপ্ন
কেন এই বিদ্রোহ? নেপালি তরুণরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কর্মহীনতার গ্যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল। ৫৬ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠীর এই দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তাদের বাধ্য করছিল দেশ ছাড়তে। বাবলু গুপ্তার ভাষায়, "আমরা মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। শুধু নেপাল নয়, সারা বিশ্বের জেন-জি প্রজন্মই পরিবর্তনের জন্য ক্ষুধার্ত।"
তরুণ নেতৃত্বাধীন দল আরএসপি (RSP) এখন পরিবর্তনের কারিগর। এই দলে যেমন আছেন তরুণ মা রঞ্জু দর্শনা, তেমনি আছেন সমাজকর্মী ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মীরা। এই সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি, যা নেপালের রক্ষণশীল সমাজকাঠামোয় এক বিশাল ধাক্কা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
যখন বাংলাদেশ, মাদাগাস্কার বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে তরুণদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেছে বা পুরোনো শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন নেপাল এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নেপালের এই তরুণ নেতাদের সামনে এখন বিশাল পাহাড়সম প্রত্যাশা:
১২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।
বিদেশে কর্মরত রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রান্তিক ও এলজিবিটিকিউ (LGBTQ) সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সঞ্জিব হুমগাইন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কেবল একজন ‘ত্রাণকর্তা’ বা ‘দেবতা’র ওপর ভরসা না করে সুশাসন এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিতে হবে।
উপসংহার: এক নতুন ভোরের প্রতীক্ষা
নেপাল এখন আর কেবল রাজতন্ত্র বা মাওবাদী বিদ্রোহের দেশ নয়। এটি এখন সেই দেশ যেখানে একজন প্লাম্বার তার ট্রান্সজেন্ডার স্ত্রীকে নিয়ে পার্লামেন্টের সামনে সমঅধিকারের কথা বলতে পারেন। পরিবর্তন হয়তো সবসময় নিখুঁত হয় না, কিন্তু নেপাল প্রমাণ করেছে যে তরুণরা চাইলে দীর্ঘদিনের জগদ্দল পাথর সরিয়ে নতুন ভোরের সূচনা করতে পারে।
সারা বিশ্ব এখন নেপালের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ নেপালের এই রূপান্তর সফল হওয়া মানেই পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে থাকা বঞ্চিত জেন-জি প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।