সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ | বৈশাখ ৭, ১৪৩৩

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
বৈশাখ ৭, ১৪৩৩
যুদ্ধের দোরগোড়ায় বিশ্ব

ট্রাম্পের হুমকি ও জাহাজ জব্দের পর আলোচনা অনিশ্চিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০২৬-০৪-২০ ১৯:৪০:০৮

ইসলামাবাদ: এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির শেষ মুহূর্তে এসে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, গত ২৪ ঘণ্টার নাটকীয় মোড় পরিবর্তনে তা এখন খাদের কিনারায়। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি বোমাবর্ষণের হুমকি, অন্যদিকে ওমান উপসাগরে মার্কিন নেভি কর্তৃক ইরানি জাহাজ জব্দ—সব মিলিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরমে।

উত্তেজনার কেন্দ্রে ‘তুসকা’ ও ‘জলদস্যুতা’র অভিযোগ

সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ওমান উপসাগরে উত্তেজনার পারদ চড়ে যায়। মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস স্প্রুয়েন্স প্রায় ৯০০ ফুট লম্বা ইরানি কার্গো জাহাজ ‘তুসকা’ (Touska)-কে মাঝপথে গতিরোধ করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান যে, নির্দেশ অমান্য করায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে গোলা ছুড়ে সেটিকে অচল করে দেওয়া হয়েছে এবং মার্কিন মেরিন সেনারা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

তেহরান এই ঘটনাকে স্রেফ ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

ট্রাম্পের আল্টিমেটাম: ‘শান্তি নয়তো ধ্বংস’

আগামী বুধবার দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব স্টাইল ‘নো মোর মিস্টার নাইস গাই’ (No More Mr. Nice Guy) নীতিতে ফিরে এসেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্তে চুক্তিতে না আসে, তবে মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস করে দেবে।

যদিও ট্রাম্পের প্রতিনিধি হিসেবে জেডি ভ্যান্স, জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, কিন্তু ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব আলোচনার পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে।

ইসলামাবাদের কূটনৈতিক তৎপরতা ও থমথমে পরিস্থিতি

পাকিস্তান এই সংকটে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। এরই মধ্যে রাজধানীর অভিজাত হোটেলগুলো সাধারণ অতিথিদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ‘রেড জোন’ এলাকায় কয়েক হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দীর্ঘ ৪৫ মিনিট টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের নেতাদের সঙ্গে তার আলোচনার সূত্র ধরে ইরানকে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ জানান। তবে ইরানের অবস্থান এখন অনড়—তারা বলছে, হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় কোনো অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়।

আলোচনার মূল বাধা যেখানে

১১ এপ্রিলের প্রথম দফার আলোচনা ২১ ঘণ্টা স্থায়ী হলেও কোনো ফলাফল আসেনি। মূলত দুটি বিষয়ে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়: ১. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চায়, যা তেহরান নিজেদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত মনে করে। ২. হরমুজ প্রণালী: এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া নিয়ে দুই পক্ষই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।

কী ঘটতে যাচ্ছে সামনে?

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান প্রকাশ্যে আলোচনার বিরোধিতা করলেও কূটনৈতিকভাবে একদম দরজা বন্ধ করে দেয়নি। তেহরান হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবে মার্কিন প্রতিনিধিদের মনোভাব বোঝার জন্য। তবে যদি বুধবারের মধ্যে কোনো ‘মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (MoU) স্বাক্ষরিত না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।

পাকিস্তানের একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "আমেরিকানরা এসেছে স্টপওয়াচ নিয়ে (দ্রুত সমাধান), আর ইরানিরা এসেছে ক্যালেন্ডার নিয়ে (দীর্ঘমেয়াদী দরকষাকষি)। এই দুই গতির ব্যবধানই এখন বড় সংকট।"

বিশ্ব এখন ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে—সেখানে কি শান্তির সাদা পায়রা উড়বে, নাকি আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে?

SStv